স্থাপত্যে বিশ্বজয় গৌরবে নতুন অধ্যায় বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির
বিশ্বমঞ্চে নিজেদের মেধা, সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী চিন্তার স্বাক্ষর রেখে নতুন এক মাইলফলক অর্জন করেছে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির স্থাপত্য বিভাগ। আন্তজার্তিক প্লাস্টিক আর্টস প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি থেকে দ্বিতীয় ও চতুর্থ স্থান অর্জন করে। এই অর্জন বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনামই বাড়াননি, উজ্জ্বল করেছেন বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ও স্থাপত্যচর্চার ভাবমূর্তিও। বিশ্বমানের নকশা, টেকসই স্থাপত্য ভাবনা এবং আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়ে অর্জিত এই সাফল্য দেশের তরুণ স্থপতিদের জন্য হয়ে উঠেছে অনুপ্রেরণার নতুন উৎস। এই সাফল্যের গল্প জানিয়েছেন আমাদের সময়কে। তুলে ধরেছেন শাহিন আলম শাওন
এ অর্জন কঠোর পরিশ্রমের ফলাফল
শেখ ইতমাম সউদ, স্টুডিও লিড এবং বিভাগীয় প্রধান, স্থাপত্য বিভাগ
প্রতিবছর লুইস বারাগান ওয়ার্কশপের উদ্যোগে মেক্সিকোর জাতীয় স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইউএনএএম) প্লাস্টিক আর্টস প্রতিযোগিতায় স্থাপত্যের প্রথম বর্ষের ছাত্রদের নিয়ে আয়োজন করে আসছে। প্রতিবছর আলাদা থিমের ভিত্তিতে প্যাভিলিয়ন ডিজাইনার প্রতিযোগিতা হয়। আয়োজনটি মূলত ল্যাটিন আমেরিকা এবং ইউনাইটেড স্টেসের বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় দুটি করে ডিজাইন জমা দিতে পারে এবং মূলত দুটি ক্যাটাগরিতে পুরস্কার প্রদান করে থাকে, তিনটি বিজয়ী পুরস্কার এবং দুটি সম্মাননা পুরস্কার। প্রথম এবং দ্বিতীয় ডিজাইনটি ক্যাম্পাসে এক মাসের জন্য বানানো হয়ে থাকে। ২০২৪ সাল থেকে তারা কম্পিটিশনটি আন্তর্জাতিকভাবে সবার জন্য উন্মুক্ত করে। ২০২৪ সালে এশিয়া থেকে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি এবং কম্বোডিয়ার প্যারাগন বিশ্ববিদ্যালয় যোগদান করে। বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি থেকে তৃতীয় এবং পঞ্চম পুরস্কার অর্জন করে। এবার ২০২৫ সালের সাইকেলের ফোকাস ছিল Architecture, in addition to form and space is experience in time. যার থিম ছিল TIME PAVILION: The pavilion doesn’t represent time, but makes it visible. মানে এমন একটা প্যাভিলিয়ন হবে যেখানে সময়কে উপলব্ধি করা যাবে, সময়কে অনুভব করা যাবে, সময়কে দেখতে পাওয়া যাবে।
শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নিয়ে সিলেক্ট করাটা খুব চ্যালেঞ্জিং ছিল
মো. আরিফ মাহতাব কবীর, প্রভাষক
আমরা যখন প্রজেক্টটা নিয়ে জানতে পারি, তারপর থেকেই স্টুডিওতে সেই অনুযায়ী চর্চা শুরু হয়ে যায়। শিক্ষার্থীরা তাদের নির্ধারিত সময়ের বাইরেও ক্লাসে অনেক সময় দিয়েছে, তাদের প্রচেষ্টা, কঠোর পরিশ্রমই তাদের এ প্রাপ্তি এনে দিয়েছে। তারা আর্কিটেকচার ডিপার্টমেন্টের শিক্ষার্থী হয়ে অন্যভাবে ভাবার সুযোগ ছিল, কিন্তু ১ম বর্ষের শিক্ষার্থী হওয়ায় আর্কিটেকচার এর বেসিক জ্ঞান, প্রিন্সিপাল আর প্রজেক্ট তুলে ধরার জন্য তাদের ইউনিক আইডিয়া এপ্লাই করেছে। ফলাফল স্বরুপ সব প্রজেক্টই সুন্দর এসেছে। সেখান থেকে দুইটি প্রজেক্ট বাছাই এবং শিক্ষার্থীদের র্পার্টিসিপেশন নিয়ে সিলেক্ট করাটা খুব চ্যালেঞ্জিং ছিল। আল্লাহর রহমতে, সিলেক্টেড দুইটা প্রজেক্টই আন্তর্জাতিক ভাবে স্বিকৃতি পেয়েছে। একটি দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে, অপরটি চতুর্থ । ডিপার্টমেন্টের জন্য এটা যেমন সম্মানের একটা বিষয়, শিক্ষক হিসেবে এই প্রাপ্তিটাও অনেক। পুরো জার্নিটার মাঝে সবাইকেই একটা চ্যালেঞ্জিং টাইম এর মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।
এই অর্জন বিশ্ববিদ্যালয় ও স্থাপত্য বিভাগের
মিনহাল আহমেদ, প্রভাষক
নিয়ম অনুযায়ী আমরা দুটি গ্রুপে প্রজেক্ট জমা দিই এবং দুটিই স্বীকৃতি পেয়েছে, আলহামদুলিল্লাহ। এবার আমরা দ্বিতীয় বিজয়ী এবং প্রথম সম্মাননা পুরস্কার অর্জন করেছি। প্রথম বর্ষের দ্বিতীয় সেমিস্টারের Design Studio II ক্লাসে আমরা সবাই নিজেদের মাঝে কম্পিটিশন করি। ২৪টা ডিজাইন থেকে জুরি করে দুটি ডিজাইন ফাইনাল করি। জুরিতে গতবারের বিজয়ী দুজন শিক্ষার্থী এমা এবং আহাদসহ আমরা তিনজন ক্লাস শিক্ষক নিয়ে জুরি বোর্ড গঠন করি। পুরোটা সময় শিক্ষার্থী আর শিক্ষকরা প্রফেশনাল স্টুডিওর মতো করে কাজ করি, আলহামদুলিল্লাহ পরিশ্রমের ফলাফল পেয়েছি। কাজটি করার সময় ঈদের ছুটি পড়ে যায়। ছাত্ররা বাড়ি যেতে বাধ্য হয়। আমরা শেষ সময় অনলাইনে কাজ নিয়ে আলাপ করি। ওদের একাগ্রতার প্রশংসা না করলেই নয় । এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে আমাদের শিক্ষার্থীরা অনেক কিছু জানতে ও শিখতে পেরেছে যা তাদের ক্যারিয়ার জীবনে প্রভাব ফেলবে। আর আমরা পেলাম আরও কাজ করার জীবনীশক্তি! শিক্ষার্থী আর শিক্ষকদের এই সুন্দর সম্পর্কই আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং স্থাপত্য শিক্ষার প্রাণরস। পরিশেষে বলতে চাই, আমাদের সব পরিশ্রম যেন সমাজের প্রতি, দেশের প্রতি আর বিশ্বের প্রতিক্রিয়াশীল এবং দায়িত্বশীল স্থপতি হতে সাহায্য করে সেটাই আমরা কামনা করছি।
বিশ্ববিদ্যালয় ও আর্কিটেকচার বিভাগের সম্মিলিত প্রচেষ্টার গৌরবময় স্বীকৃতি
হাসিন আলমাস হিমেল, শিক্ষার্থী, দ্বিতীয় বিজয়ী
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির আর্কিটেকচার বিভাগের আমাদের দল Edge of Eternity মেক্সিকোর UNAM-এর Luis Barragán Workshop আয়োজিত আন্তর্জাতিক Time Pavilion Competition-এ দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে। এই অর্জনের পেছনে বিশ্ববিদ্যালয় ও আর্কিটেকচার অনুষদের সার্বিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। স্টুডিও ক্লাসের বাইরে শিক্ষকদের অতিরিক্ত সময় দেওয়া, নিয়মিত ডিজাইন আলোচনা এবং বিভাগের কোর্টইয়ার্ডে অনুষ্ঠিত সমালোচনা ও মতবিনিময় সেশন আমাদের নকশাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতামূলক শিক্ষার পরিবেশ সৃজনশীল চিন্তা ও দলগত কাজকে উৎসাহিত করেছে, যা আন্তর্জাতিক পরিসরে সফলতা অর্জনে সহায়তা করেছে। এই সম্মান কেবল আমাদের দলের নয়, বরং বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি ও এর আর্কিটেকচার বিভাগের সম্মিলিত প্রচেষ্টার একটি গৌরবময় স্বীকৃতি।
বৈশ্বিক কম্পিটিশনের প্রজেক্ট জমা দেওয়া পুরো দলের জন্য অগ্নিপরীক্ষা ছিল
মুসাদদিক চৌধুরী, শিক্ষার্থী, প্রথম সম্মাননা
স্থাপত্যের প্রথম বর্ষে মেক্সিকোর UNAM-এর লুইস বারাগান ওয়ার্কশপের মতো একটি বিশ্বখ্যাত প্ল্যাটফর্মে অংশগ্রহণ আমার জন্য একই সঙ্গে বিরাট আনন্দ এবং দারুণ এক শেখার সুযোগ ছিল। Time pavilion : The Living Cube- প্রজেক্টটির আইডিয়া নিয়ে বারবার এক্সপেরিমেন্ট করা এবং জুরি বোর্ডের গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ডের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রতিনিয়ত নিজেদের ডিজাইনকে উন্নত করার পুরো জার্নিটা আমাদের চিন্তার পরিধিকে অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। দিন-রাত এক করে মডেলের খুঁটিনাটি নিখুঁত করা এবং একটা বৈশ্বিক কম্পিটিশনের প্রজেক্ট জমা আমাদের পুরো দলের জন্য অগ্নিপরীক্ষা ছিল। আমাদের ডিপার্টমেন্টের পর্যাপ্ত সুযোগ- সুবিধা ও সার্বিক সহযোগিতা আমাদের কাজকে সহজ করেছে। আমার বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভাগের প্রতি আমার দলের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
এ স্বীকৃতি নতুন সাফল্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা জোগাবে
তাসনিম, শিক্ষার্থী
মেক্সিকো প্যাভিলিয়ন প্রতিযোগিতায় আমাদের ‘Edge of Eternity’ প্রকল্পটি দ্বিতীয় স্থান অর্জন করায় আমরা খুবই আনন্দিত ও গর্বিত। এই প্রকল্পে কাজ করার সময় আমরা নতুন অনেক কিছু শিখেছি এবং দলগতভাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আমাদের কাজের স্বীকৃতি পাওয়া আমাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও ভালো কাজ করার উৎসাহ দিয়েছে। এই অর্জন আমাদের জন্য শুধু একটি পুরস্কার নয়, বরং শেখার এবং নিজেদের দক্ষতা প্রমাণ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ । আমরা আমাদের টিমমেট, ফ্যাকাল্টি সদস্য এবং Bangladesh University-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আমাদের ভবিষ্যতে আরও ভালোভাবে শেখা, গবেষণা করা এবং নতুন সাফল্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা জোগাবে।
প্রথম বর্ষেই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিআমাদের আত্মবিশ্বাসকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে
হোসাইন মোহাম্মদ মাবরুর এলাহী হাদী, শিক্ষার্থী
প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী হিসেবে এত বড় একটি গ্লোবাল প্ল্যাটফর্মে বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে আমাদের বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি এবং আর্কিটেকচার ডিপার্টমেন্টকে রিপ্রেজেন্ট করতে হবে, এটা ভাবতেই প্রথমে বেশ রোমাঞ্চ লাগছিল। The Living Cube প্রজেক্টটির আইডিয়া ম্যাচিউর করা থেকে শুরু করে নিখুঁতভাবে মডেল তৈরি করার পেছনে আমাদের পুরো টিমের অক্লান্ত পরিশ্রম ও অনিন্দ্য সুন্দর টিমওয়ার্ক জড়িয়ে ছিল। পুরো জার্নিতে আমাদের ফ্যাকাল্টি মেম্বার ও অ্যাডভাইজারদের দিকনির্দেশনা আমাদের ডিজাইনকে গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ডে নিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। নিজেদের প্রথম বর্ষেই এমন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আমাদের পুরো ব্যাচের আত্মবিশ্বাসকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে, যা সামনের দিনগুলোতে আরও বড় অর্জনের পথ দেখাবে।
আমরা সৃজনশীলতা ও দক্ষতাকে আরও বিকশিত করার সুযোগ পেয়েছি
শাশ্বতী ঘরামী, শিক্ষার্থী
প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করা আমাদের জন্য ছিল এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। Time pavelion – “Edge of Eternity” প্রজেক্টটির ধারণা তৈরি থেকে শুরু করে ডিজাইন ডেভেলপমেন্ট, মডেল নির্মাণ এবং চূড়ান্ত উপস্থাপনা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ আমাদের জন্য ছিল নতুন কিছু শেখার সুযোগ। বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একই প্ল্যাটফর্মে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে আমরা নিজেদের সৃজনশীলতা ও দক্ষতাকে আরও বিকশিত করার সুযোগ পেয়েছি। এই যাত্রায় Bangladesh University এবং Department of Architecture- এর সুযোগ-সুবিধা, সহায়ক পরিবেশ এবং আমাদের শ্রদ্ধেয় ফ্যাকাল্টি সদস্যদের মূল্যবান দিকনির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। আলহামদুলিল্লাহ, Time pavelion – “Edge of Eternity প্রকল্পের মাধ্যমে দ্বিতীয় পুরস্কার অর্জন আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের।
আমাদের দলগত প্রচেষ্টা, গবেষণা এবং ধারাবাহিক পরিশ্রমের ফল
ইসরাত জাহান সামিয়া, শিক্ষার্থী
সম্প্রতি আমরা “The Living Cube ” নামে একটি দল হিসেবে মেক্সিকোর UNAM ইউনিভার্সিটির প্যাভিলিয়ন ডিজাইন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করি। আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের প্রকল্পটি 1st Mention / Commendation Award অর্জন করেছে।
এই অর্জন আমাদের দলগত প্রচেষ্টা, নকশাগত চিন্তা, গবেষণা এবং ধারাবাহিক পরিশ্রমের ফল। ধারণা তৈরি থেকে চূড়ান্ত উপস্থাপনা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শেখার অভিজ্ঞতা ছিল।
আমি আমার দুই টিমমেট, Bangladesh University এবং Department of Architecture এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। এই স্বীকৃতি আমাদের ভবিষ্যতে আরও ভালোভাবে শিখতে ও কাজ করতে অনুপ্রাণিত করবে।
শাহিন আলম শাওন
২০ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
আমাদের সময়